• বুধবার , ১৭ জুন, ২০২৬ | ৩ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপি–জামায়াত জোটের মুখোমুখি লড়াই, তরুণ ভোটার ও অর্থনীতিই হতে পারে ফল নির্ধারক

ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপি–জামায়াত জোটের মুখোমুখি লড়াই, তরুণ ভোটার ও অর্থনীতিই হতে পারে ফল নির্ধারক

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:৫৬ ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত গণভোটকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে যেসব নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন বা সীমিত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছে, এবারের ভোটকে অনেকেই ব্যতিক্রমী হিসেবে দেখছেন। ২০০৯ সালের পর এই প্রথম একটি প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষ করে ২০২৪ সালের আন্দোলনে সক্রিয় তরুণ ভোটাররা। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় রাজনৈতিক সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে গেছে। অন্যদিকে বিএনপি প্রায় পূর্ণ শক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছে। দলটি ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টিতে প্রার্থী দিয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জানিয়েছেন, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন নিয়ে তারা আশাবাদী। তবে তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসলামপন্থী জামায়াত ও তাদের মিত্র শক্তি।

রয়টার্সের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটও এবারের নির্বাচনে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের একটি রাজনৈতিক শক্তি—জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)—জামায়াতের সঙ্গে জোট করায় তরুণ ভোটের একটি অংশ তাদের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই জেনারেশন জেড ভোটাররাই নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারেন।

ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের গবেষক পারভেজ করিম আব্বাসি রয়টার্সকে বলেন, বিভিন্ন জরিপে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও এখনো একটি বড় অংশের ভোটার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি বলেন, “তরুণ ভোটাররা যেদিকে ঝুঁকবে, ফলাফল অনেকটাই সেদিকে যাবে।” তার মতে, ভোটের ফল দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথনির্দেশ করবে।

রাজধানীসহ দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচারণার চিত্রেও বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যেখানে আগের নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক প্রাধান্য পেত, এবার সেখানে বিএনপির ধানের শীষ ও জামায়াতের দাঁড়িপাল্লার পোস্টার চোখে পড়ছে বেশি। দলীয় কার্যালয়গুলোতে নির্বাচনী গান বাজছে, রাস্তাঘাটে আলোচনা চলছে ভোট নিয়ে—যা আগের নির্বাচনী পরিবেশের সঙ্গে স্পষ্টভাবে ভিন্ন।

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের প্রতি ভোটারদের আগ্রহ কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নয়; বরং দলটির তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে। জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ভোটাররা ধর্মীয় বা প্রতীকী বিষয় নয়, বরং দুর্নীতি দমন, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং কর্মসংস্থানের মতো ইস্যুকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশাও এবারের নির্বাচনে একটি বড় বিষয়। প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ রাকিব রয়টার্সকে বলেন, “আগে ভোট দেওয়া বা নিজের মত প্রকাশ করা সহজ ছিল না। এবার আমরা আশা করছি, নতুন সরকার এই অধিকারগুলো নিশ্চিত করবে।” এমন অনুভূতি অনেক তরুণের মধ্যেই ছড়িয়ে আছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির ক্ষেত্রেও এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। শেখ হাসিনার ক্ষমতা হারানোর পর দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব কিছুটা কমেছে এবং চীনের উপস্থিতি বেড়েছে। বিএনপি সরকার গঠন করলে ভারতের সঙ্গে তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার হলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হতে পারে—যদিও জামায়াত দাবি করছে, তারা কোনো দেশের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নীতি অনুসরণ করবে না।

অর্থনৈতিক চাপও এবারের নির্বাচনের পটভূমিতে বড় ভূমিকা রাখছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ ২০২২ সালের পর থেকে বড় ধরনের বিদেশি অর্থায়নের প্রয়োজন অনুভব করছে। বিশ্লেষকদের মতে, একটি স্থিতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য সরকার গঠনই পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ তৈরি করতে।

সব মিলিয়ে, রাজনীতি, অর্থনীতি, তরুণ ভোটারদের ভূমিকা ও আন্তর্জাতিক প্রভাব—সব দিক থেকেই এবারের নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। নির্বাচন শেষে কার্যকর ও স্থিতিশীল সরকার গঠিত হলে তা দেশের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার ভিত্তি গড়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

বিজ্ঞাপন

https://moreshopbd.com/